ক্রীড়া সংস্কৃতি

ইয়াসের পাশে মা ও মেয়ের জুটি

ইয়াশের ক্ষতিগ্রস্তদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন মা-মেয়ে জুটি

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী,

         রত্না-রেশমা জুটি - এই 'জুটি' অভিনয়, সেটা যাত্রা বা চলচ্চিত্র জগত হোক, অথবা ইদানীং বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক জগতের নয়, সেবার জগতের মা-মেয়ের এই জুটি প্রচারের অন্তরালে থেকে গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে দুস্থ মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে কলকাতার 'গ্রেস এণ্ড গ্লোরি অব গড' চ্যারিটেবল সোসাইটির হাত ধরে মা-মেয়ে রত্না মারিনা ঘোষ ও রেশমা ঘোষের সেবার স্পর্শ পাচ্ছে  ইয়াসে বিধ্বস্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
    মে মাসের শুরুতে ভয়ংকর 'ইয়াশ' ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয়  সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের। বেঁচে থাকার সব রসদ হারিয়ে ওরা প্রকৃত অর্থে সর্বহারা। খাদ্য নাই, পরনের পোশাক নাই, পানীয় জল নাই - নেই রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে খোলা আকাশের নীচে ওরা অবর্ণনীয় অবস্থায় দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি শিশুদের। খাদ্যের অভাবে তাদের মুখের অমলিন হাসিটা  পর্যন্ত মলিন হয়ে গেছে। সরকারি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্হা তথা ব্যক্তিগত সাহায্যের উপর ঝঞ্ঝা বিধ্বস্ত মানুষগুলির জীবন পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এবার তাদের পাশে দাঁড়ালেন মা-মেয়ে জুটি।  

‌ ইতিমধ্যে এই জুটি সোনারখালি, গোসাবা, কাকদ্বীপ, মুড়িগঙ্গা প্রভৃতি এলাকার চার শতাধিক শিশুর হাতে তুলে দিয়েছে মুড়ি, দুধ, বিস্কুট, মাজা, চিপস, ছাতু, সুজি, ম্যাগি ইত্যাদি। নিজেদের প্রিয় খাবারগুলো পেয়ে শিশুরা খুব খুশি। আগামী কয়েক দিন আরও বেশি মানুষের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে তাদের আছে। শুধু ইয়াশ বিধ্বস্তদের পাশে নয় নিজেদের সাধ্যমতো সারা বছরই তারা অসহায় বৃদ্ধ, বিশেষভাবে সক্ষম মানুষের পাশে থাকেন।
‌ প্রসঙ্গত ত্রিপুরার মেয়ে রত্না ‘মারিনা’ ঘোষ বাবার কর্মসূত্রে কলকাতায় আসেন এবং ১৯৮৩ সালে মাদার টেরিজার সংস্পর্শে আসেন। কতই বা বয়স – বছর ১৫-১৬. মাদারের কাছে থাকতে থাকতে নিজেই কোন দিন যে সেবাময়ী হয়ে ওঠেন বুঝতে পারেননি। ১৯৮৮ সালে মানুষের সেবার লক্ষ্যে নিজের হাতে গড়ে তোলেন ‘গ্রেস এণ্ড গ্লোরি অব গড’। গৃহ শিক্ষকতা করে যেটুকু উপার্জন করতেন তারই একটা অংশ মানুষের সেবায় ব্যয় করে পথ চলা শুরু। কলকাতার আলিপুরে থাকলেও সুন্দরবন এলাকায় কাজের সুবিধার্থে নরেন্দ্রপুর থেকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মায়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে একমাত্র মেয়ে রেশমাও মানুষের সেবা করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। রেশমা এযুগের অত্যন্ত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র, সিরিয়াল তথা যাত্রা শিল্পী এবং সুপরিচিত সঙ্গীত শিল্পী। তার আয়ের একটা বড় অংশ মানুষের সেবার কাজেই বিলিয়ে দেন। এমনকি কয়েক বছর আগে তপন নাট্য মঞ্চে মঞ্চস্হ ‘উত্তরণ’ নামক নাটক থেকে সংগৃহীত অর্থ মানুষের সেবার কাজে ব্যবহার করেন। স্হানীয় কিছু ছেলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও রেশমা নিজেও খাদ্য সামগ্রী প্যাকিং এর কাজ করেন। তারপর নিজেই গাড়ি চালিয়ে মা’কে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায়।
রেশমা দেবীর বক্তব্য – একটাই জীবন। সেটাই যদি মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে না পারি তাহলে তো জীবনটাই বৃথা। সামান্য অর্থ নিয়ে শুরু করলেও যেভাবে সহৃদয় মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাতে আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ।
রত্না দেবীর কণ্ঠে শোনা গেল একই সুর। তিনি বললেন আমাদের মূল লক্ষ্য সবার সহযোগিতায় আমাদের কর্মকাণ্ডকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে আমার প্রেরণা বিশ্বজনীন ‘মাদার’ টেরিজা।
মা-মেয়ের কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন পশ্চিম বর্ধমানের রাণীগঞ্জের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রাজা চৌধুরী। তিনি বললেন – দীর্ঘদিন ধরেই এই জুটির সেবামূলক কাজের সঙ্গে আমি পরিচিত। যেভাবে উনারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান তাতে কোনো প্রশংসায় যথেষ্ট নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *