পুলিশ

শ্বাসরোধ করে শিশু খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার জেঠিমা

খায়রুল আনাম

 পারিবারিক বিবাদের জেরে  শ্বাসরোধ করে শিশু খুনের অভিযোগে গ্রেফতার জেঠিমা
         
রক্ত হিম করা এক শিশু খুনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বোলপুর-শান্তিনিকেতন সংলগ্ন কাশিপুর গ্রাম। ঘটনার ভয়াবহতায় এলাকার পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, বোলপুর মহকুমা পুলিশ আধিকারিক অভিষেক রায় বোলপুর থানার পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েও ফিরে আসেন। দু’বার ফিরে আসার পরে নানুর, ইলামবাজার ও পাঁঁড়ুই থানার পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আতিব খান নামে দু’ বছরের ওই মৃত শিশুটির দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে আসেন।  শিশু খুনের দায়ে অভিযুক্ত  মৃতের জেঠিমা তাজমিরা বিবিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাজমিরা বিবির বাড়ির লোকজন-সহ গ্রামের মানুষও তাঁঁর ফাঁঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। স্ত্রীর এই নৃশংসতায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন  তাজমিরা বিবির স্বামী লালচাঁঁদ খান ওরফে পিয়ার৷           মৃত আতিবের বাবা মুরশেদ খান ও তাঁর বড় ভাই লালাচাঁদ খান-সহ অন্যান্য ভাইরা পৃথক পৃথকভাবে কাছাকাছি বাড়িতেই বসবাস  করেন।  বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় সব পরিবারের ছেলেরাই খেলা করে।  মুরশেদের স্ত্রী শম্পা বিবির সাথে তাঁর স্বামীর ‘সম্পর্ক রয়েছে’ এই অভিযোগ তুলে  পিয়ারের স্ত্রী তাজমিরা বিবি কিছুদিন থেকেই জা-অর্থাৎ, শম্পা বিবির সাথে দুর্বব্যবহার শুরু করেন। ৫ আগস্ট এনিয়ে দুই জায়ের মধ্যে ঝগড়া হলে  শম্পা বিবি  তাঁর জা তাজমিরা বিবিকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেন যে, এই ধরনের কথা ভবিষ্যতে বলা হলে তিনি জা তাজমিরার গালে চড় মারবেন। তখনই তাজমিরা তাঁর জা শম্পাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ।          এলাকা সূত্র ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায় যে,  শুক্রবার ৭ আগস্ট বিকালের দিকে আতিব ও তার সমবয়সী জেঠার ছেলে বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় খেলা করছিল। তাদের দিদা সেলিমা বিবিও তখন সেখানেই ছিলেন। বিকাল ৪.২৫ মিনিট নাগাদ গ্রামের মসজিদের মাইকে আজান দিলে তাদের দিদা বাড়িতে নামাজ পড়তে চলে যান। যাবার সময় তিনি আতিবের মা শম্পাকে শিশু দু’টির উপরে লক্ষ্য রাখার কথাও বলে যান। শম্পা বিবি জানান, তিনি সামনের একটি ঘরেই শুয়ে ছিলেন। তাঁর সামান্য ঘুমও এসেছিল। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ঘুম থেকে উঠে আর ছেলেকে দেখতে পাননি। তারপরই শুরু হয় খোঁজাখুঁঁজি। ইতিমধ্যেই তার কাকা পিয়ার সাড়ে পাঁঁচটা নাগাদ বাড়ি এসে সমগ্র বিষয়টি জানতে পেরে   তিনিও ভাইপোর খোঁজ শুরু করেন। এমন কী, গ্রামে যে সব কাগজ কুড়ানিরা আসেন তাঁদের সম্ভাব্য গন্তব্যেও তিনি খোঁজ নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যেই গ্রামের মসজিদের মাইকে এই নিখোঁজের কথা ঘোষণা হতেই  গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের মানুষজনও সেখানে পৌঁছে যান। আশপাশের এলাকা ছাড়াও স্থানীয় পুকুরে জাল ফেলেও আতিবের সন্ধান করা হলেও তার কোনও সন্ধান মেলেনি। এরপরই বোলপুর থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের লোকজন ও অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরিবারের সকলের বাড়িতেও তল্লাশি চালানে হলেও  আতিবের সন্ধান না মেলায় ফিরে আসে পুলিশ। পরে আবারও ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। তাতেও  কোনও সুরাহা না হওয়ায় ফিরে আসে পুলিশ।   এভাবে তিনবার ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ।  তখনই পুলিশ দুই জা-এর মধ্যে ঝগড়া  এবং তাজমিরা বিবি তাঁর জা শম্পাকে বিবিকে যে ‘সন্দেহের’ চোখে দেখেন সেটাও জানতে পারে। এরপরই পুলিশ একজন মহিলা পুলিশ অফিসারকে নিয়ে  শুক্রবার রাত্রি দশটার সময় পুনরায় কাশিপুর গ্রামে গিয়ে  তাজমিরা বিবিকে ঘরে বসিয়ে জেরা শুরু করেন। ওই সময়  আতিবের সাথে তাজমিরা বিবির যে সম বয়স্ক শিশুটি খেলা করছিল সে কয়েকবারই ঘরের একটি আলমারির কাছে যায়। তাজমিরা বিবি ছেলেকে বার বার সেখান থেকে সরিয়ে দেন। ওই মহিলা পুলিশ অফিসারের নজরে আসে বিষয়টি। এরপরই তিনি তাজমিরা বিবিকে জেরা শুরু করেন এবং ঘরের আলমারিটি খুলতে বলেন। কিন্তু তাজমিরা বিবি জানান, তাঁর কাছে আলমারির চাবি নেই। তখনই ওই মহিলা পুলিশ আধিকারিক তাজমিরা বিবিকে হাতের রুলার  দিয়ে পায়ে আঘাত করতেই তিনি অন্যত্র থেকে আলমারির চাবি নিয়ে আসেন। পুলিশ  তাঁকে আলমারিটি খুলতে বললে, তিনি যথেষ্ট ঘাবড়ে যান। পরে তিনি আলমারিটি খুললে তার ভিতর থেকে বেশকিছু কাপড় বেরিয়ে আসে। পরে অন্য একটি চাবি দিয়ে আলমারির নীচের একটি প্রশস্ত লকার খুলতেই  আতিবের মৃত দেহটি বেরিয়ে আসে।  মৃতের গালের নীচে হামানদিস্তা দিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। তাকে যে প্রথমে শ্বাসরোধ করে এবং পরে মৃত্যু সুনিশ্চিত করতে সদ্য অনুষ্ঠিত  ঈদুজ্জোহায়  মাংস পেষার কাজে ব্যবহৃত হামানদিস্তা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আতিবকে এভাবে খুন করার সময় সে যাতে চিৎকার করতে না পারে সে জন্য তার মুখে ও নাকে কাপড় গুঁঁজে দেওয়া হয়েছিল বলে দেখা যায়। এরপরই পুলিশ  তাজমিরা বিবিকে থানায় নিয়ে আসে। তাঁর স্বামী  পিয়ার যে এই খুনের ঘটনার সাথে কোনওভাবেই যুক্ত থাকতে পারেন না, সেই দাবি করেছেন পরিবারের লোকজন। মৃতার মা  শম্পা বিবি-সহ পরিবারের লোকজন এবং গ্রামবাসীরা তাজমিরা বিবির ফাঁঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। পুলিশ ওই ঘরটি তালাবন্ধ করে দেওয়া ছাড়াও সেখান থেকে বেশকিছু সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে এসেছে। আতিবের মৃতদেহ বোলপুর মহকুমা হাসপাতালের পরিবর্তে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ।।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *