হাইকোর্ট সংবাদ

ভোট পরবর্তী হিংসায় ‘নীরব’ অফিসারদের চিহ্নিতকরণ করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, কলকাতা হাইকোর্ট

ভোট পরবর্তী হিংসায় ‘নীরব’ অফিসারদের চিহ্নিতকরণ করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, হাইকোর্ট 

মোল্লা জসিমউদ্দিন টিপু,


ভোট পরবর্তী হিংসার মামলা নিয়ে জোর ধাক্কা গেল রাজ্য সরকার। গত ১৮ জুনের কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের নির্দেশিকার উপর পুন বিবেচনার আর্জি রেখেছিল রাজ্য সরকার। তা আজ অর্থাৎ সোমবার খারিজ করে দিলো কলকাতা হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চ। শুধু তাই নয় গত ১৮ জুনের যে নির্দেশিকা ছিল, তার তদন্তের অভিমুখ পরিস্কার করে দিয়েছে আদালত। এদিন ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে একযোগে ৯ টি মামলার শুনানি চলে। সেখানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কে বিশেষ কমিটি গঠন করে রাজ্যের জেলায় জেলায় ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ গুলি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। যেসব পুলিশ অফিসার ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ পেয়ে নিস্ক্রিয় থেকেছেন। এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রান্তের অভিযোগ নিয়ে উল্টে আক্রান্তকেই চমকেছেন।সেইসব ‘নীরব’ পুলিশ অফিসারদের চিহ্নিতকরণ করতে বলা হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে। তা আগামী ৩০ ই জুনের মধ্যে জমা দিতে হবে। আজ রাজ্যের তরফে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন কে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দেওয়া হয় আদালতের কাছে।তবে তাতে অনাস্থা রেখেছে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। এদিন আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে – ‘ রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছে কোন অভিযোগই জমা পড়েনি।অর্থাৎ আক্রান্তরা রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছে অনাস্থা রেখেছে বলা যায়।অথচ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে ৬৪১ টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করলে রাজ্যের আপত্তি কিসের?  ভোট পরবর্তী হিংসায় পুলিশ এফআইআর করেনি।রাজ্য সরকারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে এত লুকোচুরি কেন রাজ্যের? ‘ এইভাবে কড়া অবস্থান নেয় পাঁচ সদস্যের বিচারপতিদের এই বৃহত্তর বেঞ্চ। আজ অর্থাৎ সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে ভোট পরবর্তী হিংসায় আদালতের নির্দেশ নিয়ে  পুনবিবেচনার শুনানি ছিল। গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ অত্যন্ত কড়াভাবে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন কে রাজ্যে ঘুরতে নির্দেশ দেয় ।পাশাপাশি রাজ্য কে সহায়তা করতে নির্দেশ দেয়।রাজ্য নিস্ক্রিয়তা দেখালে তা আদালত অবমাননার সামিল হবে বলেও হুশিয়ারি দেয় আদালত। এহেন নির্দেশে চাপে পড়ে রাজ্য সরকার গত শনিবার এই নির্দেশিকা পুন বিবেচনা করার পিটিশন দাখিল করে থাকে। যার শুনানি হয় আজ অর্থাৎ সোমবার দুপুরে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে। রাজ্য সরকার আবেদনে জানায় – ‘ সময়ের অভাবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে  পারেনি।আগেকার নির্দেশ পুন বিবেচনা করা হলে সব অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে’। আজ রাজ্যের তরফে হলফনামা জমা দেওয়া হয়। তবে তাতে কোন সাড়া দেয়নি আদালত। এর আগে কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছিল – ‘ শুধু শারীরিক আঘাত নির্যাতন নয়, চাকরি কেড়ে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে না দেওয়া একপর্যায়ে নির্যাতন।যা আদালত মেনে নেবেনা’। গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের তরফে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল – ‘ রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসা জানতে ঘুরবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরা।শুধু তাই নয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী রাজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রাজ্য কে আদালত অবমাননা মামলার মুখে পড়তে হবে’। ঠিক এভাবেই  কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চ রাজ্য কে হুশিয়ারি দিয়েছিল।কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখবে। তাদের সাহায্য করবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন বলে জানিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। ওইদিন আদালত পর্যবেক্ষণে জানায় – ‘ ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার কথা স্বীকার করেনি রাজ্য সরকার। কিন্তু আমাদের কাছে যে অভিযোগ জমা পড়েছে। তাতে ভোট পরবর্তী হিংসার প্রমাণ মিলেছে। ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরাতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মানবাধিকার কমিশন ও রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিসের প্রতিনিধিরা ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের মানবাধিকার কমিশন প্রয়োজনীয় সহযোগী পাইনি রাজ্যের কাছ থেকে। তাদের কে অসহযোগিতা করা হয়’। এরপর আদালত নির্দেশ দেয় – ‘রাজ্য কে অসহযোগিতা করার  দায় নিতে হবে। কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন আদালত কে রিপোর্ট জমা দেবে।এই নির্দেশ না মানলে আদালত অবমাননার মধ্যে পড়তে হবে রাজ্য কে’। ওইদিন এইবিধ মামলার আবেদনকারীদের আইনজীবী প্রিয়াংকা টিবরেওয়েল জানিয়েছিলেন – ‘ আমরা বারবার ভোট পরবর্তী হিংসার তথ্য দিয়েছি, তবে তা রাজ্য স্বীকার করেনি।পরে আদালত এইসব অভিযোগের সততার গভীরতা বুঝলো’।ইতিমধ্যেই ৩২৪৩ টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিস কমিটির কাছে।উল্লেখ্য,  গত সপ্তাহে বীরভূমের নানুর লাভপুর থানায় ঘরছাড়া ঘরে ফেরানোর বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন এই আইনজীবী। তারপর এক গ্রামছাড়া গ্রামে ফিরলে ব্যাপক মারধর করা হয় এক গেরুয়া সমর্থক কে।নানুরের এই ঘটনায় এখনও চাঞ্চল্য রয়েছে এলাকা জুড়ে। কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে চলছে রাজনৈতিক হিংসায় ঘরছাড়াদের নিয়ে একগুচ্ছ মামলার শুনানি। এই বৃহত্তর বেঞ্চে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডাল, বিচারপতি ইন্দ্রপ্রসন্ন মুখার্জি, বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন, বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি সুব্রত তালুকদার।গত শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ মামলা চলাকালীন জানায় – ‘ প্রত্যেক মানুষ তার নিজের বাড়িতে থাকার অধিকার রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করতে হবে রাজ্যকেই’। এরপর রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছিল – ‘ রাজনৈতিক হিংসায় ঘরছাড়াদের জন্য দ্রুত রাজ্য ইমেলের আইডি তৈরি  করছে। সেখানে অভিযোগ জানাতে পারেন ওইসব ঘরছাড়ারা’। একুশে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক হিংসায় ১৬ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটে।পাশাপাশি শতাধিক আহত হয়েছে বিভিন্ন ঘটনায়।হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। যদিও শাসক দলের তরফে বিরোধী কর্মী সমর্থকদের ঘরে প্রত্যাবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি। তবে তাতে সন্তুষ্ট নয় অনেকেই।ঠিক এই রকম পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চে চলছে ভোট পরবর্তী হিংসা মামলা গুলির শুনানি। এই বৃহত্তর বেঞ্চে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের পাশাপাশি রয়েছেন ইন্দ্রপ্রসন্ন মুখার্জি, হরিশ ট্যান্ডন,  সৌমেন সেন সহ সুব্রত তালুকদারদের মত বিচারপতিরা।গত ৩১ মে কলকাতা হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চে রাজনৈতিক হিংসায় ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানোর জন্য তিন সদস্যের এক কমিটি গড়ে দিয়েছিল। যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের সদস্যদের পাশাপাশি রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিস কমিটির সদস্যরা রয়েছেন। গত শুনানিতে রজ্যের তরফে আইনজীবী জানিয়েছেন – ‘৩ মে অবধি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা দেখার দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের’।  উল্লেখ্য,  ভোটের ফলাফল  পরবর্তী হিংসা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও বেশ কয়েকটি মামলা চলছে।রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ১৬ এর মত প্রাণ হারান এই রাজনৈতিক হিংসায়। বিরোধী দলের অভিযোগ,  শাসক দলের  নির্দেশে সুপরিকল্পিত ভাবে হিংসা চালানো হয়েছিল।যদিও তৃণমূলের তরফে জানানো হয়েছে – এই রাজনৈতিক হিংসায় তাদেরও অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন।তবে ভোটের ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক হিংসা চলতে থাকে।লুটপাট অগ্নিসংযোগ মারধর চলে।পরিস্থিতি এমন যে, ভিনরাজ্যে আশ্রয় নেয় বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকরা।রাজ্যপাল এইসব ঘরছাড়াদের আশ্রয় শিবিরে পর্যবেক্ষণে গিয়ে বিষয়টি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে আলোচিত হয়।ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে চলছে এইসব মামলার শুনানি পর্ব। রাজ্যের তরফে ইমেল আইডি করে ঘরছাড়াদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে হাইকোর্ট কে জানিয়েছিল রাজ্য।গত শুক্রবার এই মামলার শুনানিতে বৃহত্তর বেঞ্চ নির্দেশ দেয় -‘ কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখবেন।তাঁরা যে রিপোর্ট আদালত কে জমা দেবেন।সেই অনুযায়ী রাজ্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আদালত আদালত অবমাননা মামলায় রাজ্য কে যুক্ত করবে ‘।আর এতেই চাপে পড়ে যায় রাজ্য সরকার। গত শনিবার দিনই এই নির্দেশিকা পুন বিবেচনা করার পিটিশন দাখিল করে থাকে রাজ্য।রাজ্য আদালত কে জানায় – ‘ সময়ের অভাবে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন সব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পারেনি।তবে এবার সুযোগ দেওয়া হলে তা সব খতিয়ে দেখা হবে’।আজ অর্থাৎ সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্ডালের নেতৃত্বে বৃহত্তর বেঞ্চ রাজ্যের পুন বিবেচনার আর্জি খারিজ করে দেয়। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে বিশেষ কমিটি গঠন করে রাজ্যের জেলায় জেলায় ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বলে।যেসব পুলিশ অফিসাররা অভিযোগ পেয়েও ‘নীরব’ ছিলেন তাঁদের চিহ্নিতকরণ করে আগামী ৩০ জুন রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। রাজ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কে সহযোগিতা না করলে তা আদালত অবমাননার সামিল করা হবে বলে কড়া হুশিয়ারি দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চ টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *