ক্রীড়া সংস্কৃতি

মুক্তি – অন্তরা সিংহরায়

মুক্তি /অন্তরা সিংহরায়,

সভ্যতার শুরু থেকে বিশ্বের সব ধর্মে ,জাতিতে শবদেহের প্রতি অন্তিম শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করা হয় । ধর্মীয় আচার বিধি পালন করে তাকে বিদায় জানানো হয় । একজন মানুষের ইহজীবনের সমাপ্তি তাঁর শেষকৃত্যে। তাই পরিবার ও প্রিয়জনদের দায়িত্ব – কর্তব্যের মধ্যে পড়ে নিষ্ঠার সাথে অন্তিম যাত্রা সম্পূর্ণ করা ।অনেক সময় এমনটাও হয় কোনো মানুষ জীবৎদশায় গুরুত্ব না পেলেও তাঁর মৃত্যুর পর শবদেহের প্রতি পরিবার বা সমাজ দায় ফেলে দেয় না। আমাদের সংস্কৃতিতে মানুষের অন্তিম যাত্রায় থাকা পুণ্য কাজ হিসেবেও ধরা হয় । ২০২০ সালের করোনা ভাইরাস এতোটাই ভংঙ্কর যে মানুষের অন্তিম যাত্রাতেও চূড়ান্ত অবমাননা হচ্ছে । পরিবারের লোকজন ,প্রিয়জনরা জানতেই পারছে না কখন ছেড়ে যাচ্ছে তাদের আপন জন ! কি চিকিৎসা হয়েছে ,কি ভাবে মারা গেলো ,তার শবদেহটির সৎকার কি ভাবে হলো ! এখানে নেই বলতে কোথাও নেই ! মানুষ যেন মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে । হে ঈশ্বর এ কোন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা । এর শেষ কোথায় !
মানুষ শৈশব থেকে সারাটা জীবন গোছাতে থাকে ,কখনো জীবন ,কখনো সম্পর্ক ,কখনো ভবিষ্যৎ ,আরো কত কি থাকে তালিকাতে ।মুহূর্তে কি সব ছেড়ে যাওয়া যায় ? এই শরীর নামক যন্ত্রটা হঠাৎ করে বন্ধ হলেই অস্তিত্ব শূন্য । এতো সাধের তিল তিল করে গড়া সংসার ,সম্পর্ক, সন্তান সবাইকে বুঝি ছেড়ে যেতে হবে । সময় বড়ো অল্প ,সময় যে শেষ হয়ে আসছে ।
আজ বড়ো সময় কম গো ,কত সময় যে নষ্ট করেছি । পড়াশোনার জন্য শাসন করতে গিয়ে মন ভোরে খোকনকে ভালোবাসতে পারিনি , কেন মায়ের মাথার কাছে বসে মন ভরে দেখেনি তাকে ,কত দিন বাবার পা টিপে দিই নি । এরকম হাজারো অসমাপ্ত কাজ এক নিমেষে সমাপ্ত হয়ে যাবে । অসমাপ্ত থাকবে সারাজীবন। এরকম নানান ভাবনায় তন্ময় হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মল্লিকা। আটারো দিন হাসপাতালের বিছানায় চোখের কোণায় কালো গাঢ় ছাপ , শরীরটা মিলিয়ে গেছে বিছানায় । জ্বর নেই শরীরে ,অসম্ভব এক দুর্বলতা । দিন দিন বাড়ি ফেরার সম্ভবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে ।শরীর জবাব না দিলেও মন যে দিয়ে দিচ্ছে । চোখের সামনে বিছানাগুলো ভরে যাচ্ছে আবার মুহূর্তের মধ্যে পলিথীন দিয়ে ঢেকে সরে যাচ্ছে চোখের অদূরে । হায় ঈশ্বর এ কেমন মৃত্যু মিছিল !
হঠাৎ নার্স দিদির চিৎকার ২২০ নাম্বার বেডের রিপোর্ট নেগেটিভ । আজ ডাক্তার বাবু উনাকে ছেড়ে দিতে বলেছেন । নাম্বারটা শোনা মাত্র মল্লিকা সজাগ হয়ে উঠলো। কি শুনলাম ! তবে কি আজ আমার ছুটি ,আমার মুক্তি ! আমি জয়ী হতে পেরেছি সবশেষে ! আমি বাড়ি ফিরবো আমার আপনদের মাঝে। তন্ময় , ক্লান্ত ,ভারাক্রান্ত চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠলো মুহূর্তের মধ্যে মুক্তির খবরে । পাশের বেডের জন্য আবারো একটা পলিথীন এলো। বডিটা পলিথীনে ঢোকাতে ঢোকাতে হসপিটালের স্টাফেরা বলে উঠলো “একটু অক্সিজেনের জন্য দারুণ কষ্ট পাচ্ছিলেন , আজ মুক্তি পেলেন । ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *