সাহিত্য বার্তা

উড়ান (পর্ব ৬)

উড়ান (পর্ব- ৬),
দেবস্মিতা রায় দাস

 পরের কয়েকটা দিন পালকের জীবনে যেন দুর্বিষহ ঝড় নেমে এল। মাকে নিয়ে ডাক্তার বদ্যিতেই কেটে গেল দিনের অধিকাংশ সময়। সেইদিন শো থেকে ফিরেই ঘর চাবি দিয়ে খুলে ঢুকে দেকে মা নীচে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। সাথে সাথেই বন্ধুদের ফোন করে। সকলে মিলে তক্ষুনি এম্বুলেন্স ডেকে মাকে নিয়ে যায় কাছের একটি হাসপাতালে। সকাল অব্দি সকলে ওখানেই ছিল। দিন তিন চারেক বিস্তর ছোটাছুটি যায় তাদের। অফিসে জানিয়েই দিয়েছিল। সবসময় জিৎ তার পাশে ছিল। 

মাঝে একদিন করণের একটা দায়শারা ফোন এসেছিল, পালকও হুঁ হাঁ করে কাটিয়ে দিয়েছে। তার মন একপ্রকার বিকল এখন বলা যায়। সম্পর্ক দূরে থাক, তার সাথে বিন্দুমাত্র আলাপচারিতারও রুচি তার নেই। এই ব্যাপারে কারুর সাথে এখনো পালক কোনো কথা বলে নি, পরিস্থিতিও নেই। মাঝে এক দিন প্রীতম আর সুরভির সাথে গল্প করে একটু মন ভালো হল, ওরা এসেছিল একদিন।

হপ্তার শেষের দিকে অনেক চেষ্টাচরিত্র সত্বেও পালককে ছেড়ে মা চলে গেলেন। চোখের জল আর বাঁধ মানলো না পালকের। অনেক কষ্ট করেছিলেন মা তার জন্য, তাকে একটু ভালোভাবে রাখার জন্য। খুব ভালোবাসতেন তাকে। এতো সমস্যার মধ্যেও তাকে যতোটা পারা যায় আগলে আগলে রাখতেন। এখন পুরো একা হয়ে গেল।

প্রথম কয়েকদিন পাথরের মতোন হয়ে থাকলো পালক। বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসছে তাকে। জিতের সাথে পর্যন্ত কথা বললো না কয়েক দিন। চুপ করে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতো। কাজটাও ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। জীবনটাকে আর যেন ফেস করতেই ইচ্ছা করছিল না পালকের। গান নিয়েও বসতে ইচ্ছা হচ্ছেনা।

এমত অবস্থায় প্রায় এক মাস পর এক এমন কান্ড ঘটল পালকের জীবনে যা বেশ অকল্পনীয় তার কাছে। বাড়ির কাছে একটা ব্ল্যাক সেভরোলেঁ গাড়ি এসে থামলো একদিন। তা থেকে প্রচন্ড অকাঙখিত ভাবে নেমে এলেন রোহিত রায়। জিৎ ছুটে গিয়ে খবর দেয় পালককে। অত্যন্ত অবাক হয় পালক! জীবনের সব রঙ হারাতে বসেছিল সে। এই ছোট বাড়িতে দুটোই ঘর, কোথায় বসাবে কি করবে ভেবে অস্থির হয়ে যায় পালক। রোহিত রায় কিন্তু বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে একটা চেয়ার টেনে নিজেই বসে তার সাথে আসা আর একজনকে পাশের টুলটাতেই বসে পড়তে বলেন। পালক দেখে তাঁর সাথে এক অতি আকর্ষণীয়া সুন্দরী মহিলা এসেছে। প্রথমে উনি ওকে আলাপ করান এখনকার উঠতি একজন “ফ্রেন্ডস হাইফাইভ এফ এম” এর আর জে মীরা বলে, আর তার পরে খুব অবাক আর আহত চোখে পালকের দিকে তাকিয়ে বলেন….

“আমি তোমাকে এতোটাও আনপ্রফেশনাল ভাবিনি কিন্তু পালক। দেখো আমাদের কাজের ধরণটা কিন্তু অনেকটাই আলাদা বাকি অনেকের থেকেই। তোমার মধ্যে বোধহয় একটা শিল্পীকেই দেখতে পেয়েছিলাম। আর তাই, তোমায় আমার খুবই ভালোলেগেছিল। ইনফ্যাক্ট, আমার আর রীনা ম্যাডাম দুজনেরই। তাই করণের ‘হোয়াট ডিড ইউ সি ইন দ্যাট গার্ল স্যার?’ মার্কা কথা সত্বেও তোমাকে আমরা একবারেই সিলেক্ট করেছিলাম,, বাট..”

বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন….

“ইউ ফেইলড আস!”

করণের নামটা শুনেই পালকের গা চিড়বিড় করে উঠল। এরকম কথা বলে তাহলে ওর সাথে ওইসব ন্যাকামির কি দরকার ছিল? সব তাহলে নাটক! কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন….

“দেখো আমরা জানি যে তোমার উপর দিয়ে কেমন ঝড় বয়ে গেছে বা যাচ্ছে,, বাট জীবন তো থেমে থাকে না বলো। আজ প্রায় এক মাস হয়ে গেল অফিসে আসা তো দূরে থাক, কারুর ফোন পর্যন্ত রিসিভ করো নি। কতোবার কল করা হয়েছে তোমায় অফিস থেকে, রীনা ম্যাডাম নিজে করেছেন!”

কথাটা সত্যি তা পালক ভালোভাবেই জানে। ফোন ধরেনি কারণ আবার কাজে যেতে পারবে কিনা সেটাই সে বুঝে উঠতে পারছিলো না।।

“সামনে একটা ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন আছে আমাদের দুবাইতে.. সব চ্যানেলের তরফ থেকেই কন্টেস্ট্যান্টস আসছে, আমি চাই তোমায় নিয়ে যেতে ওখানে পালক। পাঁচজনকে সিলেক্ট করেছি আমরা। তোমার ভয়েসের মধ্যে একটা অন্য কিছু আছে.. আমি শুনেছি। সেদিন তোমার একটা ওইটুকু কথায় আমি স্পেলবাউন্ড হয়ে গেছিলাম! তাই আজ সাথে করে আমি আর একজন সিলেক্টেড আর জে মীরাকেও এনেছি। ও এখন খুব নাম করেছে, আর আমাদের কাছ থেকে তোমার কথা শুনে তোমার সাথে আলাপ করতে চাইছিল। ওও অনেক স্ট্রাগল করে অনেক ছোট জায়গা থেকেই উঠে এসেছে পালক, আর আজ দেখো ও কোথায়! তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড আর তোমার কাছে এখানে আসছি শুনে ও নিজে থেকে এখানে আসতে চাইল। এবারে তোমরা একটু গল্প করো.. বাট আই ওয়ান্ট ইউ এট অফিস ফ্রম মানডে। ওকে??”

জিৎ এতোক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতোন প্রায় সব শুনছিল। এবারে একটু হেসে স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল..

“আপনি কোনো চিন্তা করবেন না স্যার ও আসবে, ঠিক আসবে”।

রোহিত একটু হেসে জিতের কাঁধে একবার হাত রেখে বেরিয়ে গেলেন। পালকের দুচোখে তখন আবার জল। এই কদিনে তার মন এমন হয়ে রয়েছে কিছু একটু অন্যরকম হলেই চোখে জল চলে আসছে। এবারে মীরা এগিয়ে এসে তার হাতটা ধরল। পালক অশ্রুভরা চোখে তাকালো তার দিকে। ফর্সা, বড়ো বড়ো চোখ আর কোঁকড়ানো চুলে মীরা দারুণ আকর্ষণীয়া। একনজরেই দেখে কোনো কোনো মানুষকে খুব ভালোলেগে যায়। মীরা তাদের মধ্যে একজন। বেশ খানিক্ষন কথা বলল পালক মীরার সাথে। তারও অনেক কথা শুনল। অবাকও হল। মীরার মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা তাকে বেচে দিয়েছিল একটা বাজে লোকের কাছে মদের নেশায়। সেখান থেকে কোনোমতে পালিয়ে আসে এখানে। রোহিত স্যারের অনেক অবদান আছে তার ব্যাপারে। খুব প্রশংসা করছিল মীরা।

আরো একবার ধাক্কা খেল পালক জীবনে, নতুন করে আরো কিছু শিখলো। একটা কয়েনের এপিঠ ওপিঠের মতোন একটা মানুষেরও বিভিন্ন রূপ থাকে। তুহিনার কথার সাথে বা অফিসেও কানাঘুষোয় আসা কথার সাথে এই কথার কতো অমিল। আবার রোহিত রায়ের সাথে গাড়িতে ফিরে আসার সময় মীরা তাকে একপ্রকার প্রমিস করিয়ে নিল আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার। সবথেকে বেশী খুশি হল জিৎ। পালককে যে বড্ডো ভালবাসে সে!

সত্যি পরের মাস থেকে আবার অফিস আসতে শুরু করল পালক। এই কদিনে পালকের বিপুল পরিবর্তন হয়েছে, অনেকটাই যেন মানসিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে সে। অফিসেও অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। রীনা ম্যাডামের কাছে থেকে একটা দারুণ ওয়েলকাম পেল, দারুণ খুশি হয়েছেন তিনি। পালককে তিনি বেশ পছন্দের চোখেই দেখতেন। বাকিদের সবারই ট্রেনিং প্রায় শেষ এক একজনকে একেক জায়গায় স্লট ভাগ করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকেই কোনো একজন প্রসিদ্ধ আর জের পাশে বসে প্রোগ্রাম এটেন্ড করছে। পালকের খালি মনে হচ্ছিল সে বুঝি বেশ পিছিয়ে পড়েছে সকলের থাকে।

সুরভি তাকে দেখামাত্রই জড়িয়ে ধরেছিল। তবে এতোসবের মধ্যেও সকলের মধ্যেই একটা চাপা টেনশন ভাব, সামনের সেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে। পালক এসেই দেখেছে সিলেকশন লিস্ট টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে.. তবে তাতে পাঁচজনের বদলে আটজনের নাম। আর জে মীরা সহ তার নাম ওই লিস্টে দেখে আবার তার চোখে জল চলে এসেছিল। রোহিত স্যারের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ সে। বলতে গেলে তার জন্য অনেক করলেন তিনি। তার যখন খুব এই কাজটার দরকার ছিল.. তখনই তাকে কাজটা দিয়েছিলেন তিনি। আর এখন যখন তার মন একদম ভেঙে পড়েছিল মাকে হারিয়ে.. আবার তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছেন তিনি।

পালক বাদ দিয়ে বাকি সাতজনই কিন্তু মোটামুটি নামকরা আর জে। এই কারণে আরো কিছু আর জে সহ তার গ্রুপেরও বেশ কজন ঈর্ষার চোখেই দেখছে তাকে, পালকের মনে হল, সুরভি আর প্রীতম বাদে! কয়েকজন তো এতোদিন পরে তাকে দেখেও ভালো করে কথাই বললোনা।

রোহিত স্যারকে যথারীতি আবার সকাল থেকেই দেখতে পায়নি পালক। খুবই ব্যস্ত থাকেন তিনি। লাঞ্চের সময় আবার সুরভি এসে বসল তার পাশে। অনেক গল্প হল। তার মায়ের হাতের করা পরোটা আচার খাওয়ালো, পালকের ফেভারিট। পালকের চোখে আবার জল আসতেই তাকে আবার জড়িয়ে ধরল সুরভি। কনগ্র‍্যাচুলেট করল তাকে দুবাই ট্রিপের জন্য। কিন্তু পালক খুব নার্ভাস, তার অনেক ট্রেনিং চাই যে.. মাঝে যে অনেকদিন গ্যাপ পড়ে গেছে।

অবশ্য তাই নিয়ে আর বেশীক্ষণ চিন্তা করতে হল না পালককে। যিনি কাজ দেন তিনিই করিয়ে নেন এই কথাটাকেই সত্যি করে সেইদিন বিকেলেই তার সাথে দেখা করলেন রোহিত রায়, আর পরিস্কার জানিয়ে দিলেন এখন বাড়ি যাওয়া চলবেনা। এবার থেকে রোজ তার নর্মাল অফিস আওয়ারের পর স্যামের কাছে তার সামনে চলবে ভয়েস মডুলেশন, ভয়েস থ্রো আর স্পিকিং স্টাইল এবং টোন ট্রেনিং। প্রায় এক হপ্তা। এতোক্ষণ থাকতে হবে শুনেও পালকের একটুও কষ্ট হল না, খুব এক্সাইটেড লাগলো জীবনটাকে ঘুরে দেখার আস্বাদ পেয়ে।।

ক্রমশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *