স্বাধীনতা সংগ্রামী মিহির লাল চট্টোপাধ্যায়ের ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী
সেখ সামসুদ্দিন, ১৮ ডিসেম্বরঃ সম্প্রতি বিজয় দিবসে অতি সাধারণভাবে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী মিহির লাল চট্টোপাধ্যায়ের ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হয় সিউড়িতে বীরভূম সাহিত্য পরিষদ ও মিহিরের লাল স্মৃতিরক্ষা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বীরভূম সাহিত্য সভা হলে। বীরভূম সাহিত্য সভার সভাপতি শান্তি কুমার মুখোপাধ্যায় সুন্দরভাবে মিহির বাবুর কার্যকলাপ ব্যক্ত করেন। তাঁতি পাড়ার ৯৪ বছরের বীণাপাণি গুঁই বাবুর ফটোতে মাল্যদান করার সময় চোখের জলে ভাসিয়ে ফেলেন। সাহিত্য সভার সম্পাদক সবিস্তারে স্মৃতি রক্ষা কমিটির গঠন ও কার্যকলাপ কিভাবে কাজ করেছে তা তুলে ধরেন। বিশিষ্ট বাংলার দিকপাল সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল তথা ভাইস চ্যান্সেলর রমা রঞ্জন মুখার্জীর পুত্র দেব রঞ্জন মুখার্জী খুব সুন্দর ভাবে বাবুর কার্যকলাপ ব্যক্ত করেন এবং একটি কবিতার বই প্রকাশের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। বিশিষ্ট গবেষক শিক্ষক সাহিত্যিক প্রাক্তন প্রিন্সিপাল তথা শিক্ষারত্ন ডক্টর সোমনাথ মুখার্জী তার গবেষণা লব্ধ মনোগ্রাহী যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষার্থক কাজ সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেন। বিশিষ্ট সমাজসেবী শিক্ষাবিদ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সমাজ সংস্কারক তথা শিক্ষক তাঁতীপাড়ায় মিহির বাবুর চিরসাথী তথা সর্বক্ষণের সাথী কালিপদ দাস তার স্মৃতিচারণ বইয়ের মাধ্যমে বাবুর ও তার সান্নিধ্য পাওয়া নক্ষত্রদের জীবন বৃত্তান্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। জন্ম ও গ্যাজুয়েট পর্যন্ত শিক্ষা নদীয়াতে সম্পূর্ণ হলেও তিনি পাঞ্জাব হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশ তথা সমগ্র ভারতবর্ষে দেশকে স্বাধীন করার জন্য বিভিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কখনো ব্রাদারহুড অথবা অভয়াশ্রমে অথবা পথে পথে ভিক্ষা করে আত্মগোপনের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করার ব্রত নেন। নেতাজী সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, রাসবিহারী বসু, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, ভগৎ সিং প্রভৃতি মহাপুরুষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। তিনি কংগ্রেসের অধিবেশনে রামপুরহাটে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে আসেন I বিধানসভায় তিনি নিজের জেতা-সিট নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে দেন। বিশিষ্ট জাতীয় শিক্ষক শিক্ষারত্ন জাতীয় মেন্টর গবেষক পরিবেশবিদ ডঃ সুভাষচন্দ্র দত্ত বলেন তাঁতীপাড়ায় মামার বাড়িতে গেলে ছোট অবস্থায় কোলে তুলে আদর করতেন এবং যত ভালো-মন্দ ফল মূল খাবার আসতো তা দিতেন। তিনি আমার মায়ের নাম শান্তি থাকায় আমাকে শান্তিনন্দন বলে ডাকতেন। তিনি শুধু ছোটদের ভালবাসতেন তাই নয়, শিক্ষা স্বাস্থ্য ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাতিপাড়া থেকে বক্রেশ্বর পর্যন্ত দু কিলোমিটার একেকজনকে এক একদিন লিডার করে দিয়ে খুব সহজেই খেলার ছলে নামতা ছড়া ইংরেজি মাসের নাম সপ্তাহের নাম এবং স্লোগান দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে শিখিয়েছিলেন I আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনতাম। চন্দ্রপুর জঙ্গলে আদিবাসীদের দিয়ে তসর চাষ করার সময় আমরা কাক তাড়ানো তসর সংগ্রহ করা এই সমস্ত কাজগুলো করতাম। চোখ অপারেশন ক্যাম্পে রোগীদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করতাম। উনি সারা গ্রাম পদক্ষেপণের সময় প্রত্যেক বাড়ির ও বাড়ির লোকের পরিচিতি ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতেন। যেমন ইনি হচ্ছেন তাঁতীপাড়ার প্রথম স্নাতক, ইনি হচ্ছেন অংকের জাহাজ, .. এই সমস্ত। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষ গড়তে এসেছিলেন সেই উদ্দেশ্য সাধিত না হয় তিনি রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। তিনি ক্ষমতা-লোভী অসৎ সঙ্গীদের ত্যাগ করে বীরভূমের তাঁতী পাড়া ও তার সংলগ্ন এলাকায় জাতীয়তাবাদী উন্মেষ ও নারী শিক্ষা দীক্ষা ও স্বাবলম্বী হওয়ার দিশা দেখান I তাতিপাড়া তাঁত শিল্পকে জগত বিখ্যাত করেন। বীরভূম জনসেবা প্রতিষ্ঠান, হোমিওপ্যাথি দাতব্য চিকিৎসালয়, আরামবাগ হ্যাচারি ইত্যাদি স্থাপন করেন। চাষের জন্য বিভিন্ন ধরনের দেশি বীজ সহ সেচ ব্যবস্থার উনতি সাধন করেন। তার মতাদর্শে এলাকা নৈতিক শিক্ষা স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক শিক্ষা পায় এবং আদর্শ মানুষ ও দেশ গঠনে সাহায্য করেন। এই অল্প পরিসরে তাকে বলা ও ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। আজ যে নৈতিক শিক্ষা ও প্রতিবাদ করার সাহস উনার কাছ থেকেই পেয়েছি, আর একটা কথা না বললেই নয়, মিহির অর্থাৎ সূর্যের রশ্মি কালিপদ দাস এর স্মৃতি দলিলরূপ বই সকলকে তার ও সমসাময়িক সময়কে কিছুটা হলেও বুঝতে সাহায্য করবে। বাবু আজও আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় প্রতি মুহূর্তে। ড. দত্ত তাকে বসন্ত সশ্রদ্ধ প্রণাম, অভিবাদন ও স্যালুট জানান।










