বিজেপি বিধায়িকার মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে কটুক্তি ও কুৎসিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি

বিজেপি বিধায়িকার মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে কটুক্তি ও কুৎসিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি

রাজ্য বিধানসভা ও বিধানসভার বাইরে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে বিজেপি বিধায়িকা যে তীব্র আপত্তিজন কুরিচিকর মন্তব্য করেছেন, মাদ্রাসা শিক্ষক- শিক্ষাকর্মী সমিতি তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার অন্যথায় বিধায়ক পদ থেকে বরখাস্তের দাবি জানাচ্ছে।

মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী সমিতি দায়িত্বশীল সংগঠন হিসেবে দায়িত্ব সহকারেই দাবি করছে মাননীয়া বিধায়িকা অত্যন্ত নিম্নরুচিশীলতার পরিচয় প্রদর্শন করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস আইপিএস হয়না, বরং ক্রিমিনাল তৈরি হয়। আদতে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছুই জানেন না এবং বিদ্বেষী মননের কারণে মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে খবরাখবর নেওয়ার ইচ্ছেও ওনার ছিলনা।

বাংলা তথা ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা সামাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পরাধীন ভারতে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন মাদ্রাসার ছাত্র বা শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গগণ।

মাওলানা আবুল কাসিম নানুতুবির দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পিছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।

মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, দক্ষ প্রশাসক তৈরি করার দৃষ্টান্ত হাতে গোনা নয়। সর্বক্ষেত্রেই তালিকা বেশ দীর্ঘায়িত।

চিকিৎসা শাত্রের উদ্ভাবক আবি আলি সিনা যিনি ইবনে সিনা নামেই খ্যাত, সেই ইবনে সিনা মাদ্রাসার ছাত্র। চিকিৎসা, দর্শন, অঙ্ক প্রভৃতি শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে দু’শো পঁয়ষট্টিটি আকর গ্রন্থ রচনাকার আল কিন্দী মাদ্রাসার ছাত্র।

উপমহাদেশের মাদ্রাসা থেকে বেরিয়েছেন জাস্টিস সৈয়দ আমির আলি, তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক ও হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। খ্যাতনামা বিজ্ঞানি ডঃ মুহাম্মাদ কুদরত ই খোদা, কম্যুনিস্ট পার্টির চার জন প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে মোজাফ্ফার আহমেদ ওরফে কাকাবাবু ও মাওলানা হসরত মোহানিও মাদ্রাসা পড়ুয়া ছিলেন।

স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রীসভার প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি এমনকি উপরাষ্ট্রপতি অর্থাৎ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, রাজেন্দ্র প্রসাদ ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, এনাদের সকলেরই শিক্ষা সংযোগ মাদ্রাসার সঙ্গে ছিল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী মাননীয় মোনমোহন সিং এর প্রাথমিক শিক্ষা মাদ্রাসা থেকে।

সবিশেষ উল্লেখ্য, দলিত শূদ্রদের জন্য শিক্ষাঙ্গনের দরজা বন্ধ থাকলেও মাদ্রাসা শিক্ষার দ্বার অবারিত ছিল বলেই ভারতবর্ষ গুরুচাঁদ ঠাকুরের মত ব্যক্তিত্ব পেয়ে গর্বিত হয়েছে।

রাজ্য সরকার মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ৫৭১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে ঠিকই, কিন্তু এই বরাদ্দের বাস্তবতা নেই। তাছাড়া সম্পূর্ণ বরাদ্দটাই মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য নয়। সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা মাত্র।

বাংলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস কমবেশি ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-তৃতিয়াংশ। এই এক-তৃতীয়াংশ কেবল মুসলমান নয়। খ্রিষ্টান, শিখ, পারসি, জৈন, বৌদ্ধদের ধরে। সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির হলেও কোনও বছর লক্ষ্য পুরণ হয়না। তাছাড়াও সংখ্যালঘু খাতের অর্থে হাজার হাজার স্কুলের বিল্ডিং থেকে হোস্টেল নির্মাণ এমনকি কলেজ বিল্ডিংও নির্মাণ হয়েছে। মাত্র ৬১৪টি মাদ্রাসার মধ্যে দুই থেকে আড়াই শো হোস্টেল আর স্কুলের জন্যে হাজারেরও অধিক হোস্টেল যেগুলি সংখ্যালঘু দপ্তরের অর্থানুকূল্যে নির্মিত ও পরিচালিত হয়। স্কুল কলেজে তো আর মাদ্রাসা শিক্ষা হয়না। তাহলে বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধিতে সমস্যা কোথায়? তা ছাড়া, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রায় পঁচিশ শতাংশ অমুসলিম। শিক্ষকের প্রায় ৪০ শতাংশ অমুসলিম। এমনকি ১৫ শতাংশ হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হিন্দু। এখন অগ্নিদেবীরা স্পষ্ট করুন শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশ অমুসলিম শিক্ষার্থীরাও কি দুষ্কৃতি? ৪০ শতাংশ অমুসলিম শিক্ষকরাও দুষ্কৃতিদের শিক্ষক!

মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞানি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিক তৈরি হচ্ছে। তার কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করা যায়।

মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস, আইএএস আইপিএস হয়না জঙ্গি দূষ্কৃতি তৈরি হয় এই জঘন্য অপবাদের জবাব দেওয়া যায়, প্রতিবছর মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বিসিএস আইএএস আইপিএস হওয়ার যেসব খবর সামনে চলে আসে তার ছোট্ট একটা তালিকা দিয়ে।

২০১৯ সালে হুগলী জেলার আদাবি সোসাইটি হাই মাদ্রাসার ছাত্র মুহাম্মাদ ইসরাইল ডব্লিউবিসিএস এক্সিকিউটিভ পরীক্ষাতে ২২ রেঙ্ক করে বিডিও হয়েছেন। বীরভূমের আমাইপুর হাই মাদ্রাসার ছাত্রী জয়নব খাতুন বিজ্ঞানী হিসেবে ২০১২ আমেরিকার কলেজ অব আর্টস অ্যাণ্ড সায়েন্সেস, বোয়সি স্টেট এর রিসার্স এ্যাসিসন্টেন্স প্রফেসর নিযুক্ত হন। মুর্শিদাবাদের নাচনা হোসেনিয়া হাই মাদ্রাসার ছাত্র ইমাম পুত্র সাইদুর রহমান আমেরিকার অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী। ২০২৩ সালে নিট কোয়ালিফাই করে ডাক্তারি পড়ায় যোগ দেয়, মাদ্রাসার ছাত্রী কুরআনের হাফিজা কাশ্মীরী কন্যা বাশিরাহ মেহরাজ, ও আফিফা খান। ২০১৯ সালে সিভিল সার্ভিসে ৭৫৯ রেঙ্ক করে সার্ভিসে যোগ দেন উত্তরপ্রদেশের আজমগড় মুবারকপুরের “মাদ্রাসা জামিয়াতুল আশরাফিয়ার ছাত্র মাওলানা শাহিদ রেজা খান। ২০০৮ সালে দেওবন্দ মাদ্রাসার ছাত্র ওয়াসিম – উর রহমান ৪০৪ রেঙ্ক করে আইএএস হন। ২০১৩ সালে উত্তরপ্রদেশের মাউ এর” “মাদ্রাসা আল আরাবিয়া”-র ছাত্র মাওলানা মুহাম্মাদ জাফর সফল আইএএস হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমাদের রাজ্যের বর্তমান প্রথম সারির আইএএস, ডঃ পি বি সালিম-র প্রাথমিক থেকে উচ্চপ্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা মাদ্রাসা থেকে। তিনিও তো দক্ষ প্রশাসক।

রাজ্যে সরকার অনুমোদিত ও পোষিত মাদ্রাসার দুটি ধারা একটি হাই মাদ্রাসা, যা মূলত হাই স্কুলের সমান পাঠক্রম, অতিরিক্ত কেবল একশো নম্বর ইসলম পরিচয়। অপরটি হচ্ছে সিনিয়র মাদ্রাসা। যার পাঠক্রমে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পূর্ণ বিষয়ের সাথে আরবি ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ের মিশেল। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগে ১০০ নম্বর কম আছে। এই সিনিয়র মাদ্রাসার ছাত্র ছাত্রীরাও একশো নম্বর কম বিজ্ঞান পড়েও ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার এমনকি বিসিএসও হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। জ্বলন্ত প্রমাণ অনেক রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বনমালীপুর আবু জাফরিয়া সিদ্দিকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার দুই ছাত্র, আমিনুল ইসলামরা দু’ ভাই, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষে পাঠরত।

সুতরাং মাদ্রাসাও তথাকথিত মূলস্রোতের শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সমাজকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস, আইএএস, আইপিএস প্রভৃতি উপহার দিয়ে চলেছে। এমন হাজারো জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত থাকার পরেও জাতি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করে দেশের সংবিধান ও আইনকে অবমাননা করছেন অগ্নিমিত্রা দেবী। এমন আইন প্রণেত্রী আইনসভায় বেমানান। সুতরাং তিনি অবিলম্বে নিঃশর্ত ক্ষমা চান, অন্যথায় আইনসভা থেকে তাকে বরখাস্ত করার দাবি জানাচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী সমিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *