প্রায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলো সুপ্রিম কোর্ট
মোল্লা জসিমউদ্দিন,
বৃহস্পতিবার বহু প্রতীক্ষিত প্রায় ২৬ হাজার (২৫,৭৫৩) চাকরি বাতিল মামলার রায় ঘোষণা করলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। গত ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগের পুরো প্যানেল বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, -‘কারচুপি করা হয়েছে। কোনওভাবেই যোগ্য অযোগ্য বাছাই করা সম্ভব হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপের কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই’।এদিন রায় ঘোষণার সময়ে প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না বলেন, – ”আমাদের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটিতে এমন ভাবে প্রতারণা হয়েছে যা সংশোধনের অযোগ্য। বৃহৎ পরিসরে জালিয়াতি হয়েছে। তথ্য গোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা প্রক্রিয়াটিই চূড়ান্তভাবে অবৈধ। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে।” এসএসসি একটি বেসরকারি সংস্থাকে ওএমআর উত্তরপত্র স্ক্যান ও মূল্যায়নের জন্য নিযুক্ত করেছিল। কিন্তু পরে ওই সংস্থার আর একটি বেসরকারি সংস্থা কে এই কাজের বরাত দেয় । সিবিআই জানিয়েছে, উত্তরপত্রের ডিজিটাল কপি নায়সা-র কাছে জমা পড়লেও মূল হার্ড কপি এসএসসি-র অফিসেই ছিল।২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সিবিআই তদন্তে প্রাক্তন নায়সা কর্মী পঙ্কজ বানসালের কাছ থেকে তিনটি হার্ড ডিস্ক উদ্ধার করা হয়, যেখানে স্ক্যান করা ওএমআর ডেটার রেকর্ড ছিল। তদন্তে দেখা যায়, এসএসসির -এর সার্ভার ও বানসালের সংরক্ষিত সার্ভারে নম্বরের অমিল ছিল।এদিন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ১/ প্রায় ২৬ হাজার নিয়োগ সম্পূর্ণ রূপে বাতিল করল সু্পিম কোর্ট।২/সম্পূর্ণ নতুন একটি সিলেকশন প্রসেস হবে, তা তিন মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে।৩/ এই তিন মাসের মধ্যে যাঁরা বৈধ, তাঁরা যে বিভাগে কাজ করতেন, সেখানে তাঁরা চাকরি চালিয়ে যাবেন। তাঁরা তিন মাস ধরে বেতনও পাবেন। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের তরফে অযোগ্যদের তিনটে ক্যাটাগরি করে দেওয়া হয়েছে। কারা কারা ব্ল্যাঙ্ক ওএমআর শিট জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের নামের তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা রয়েছে। এছাড়াও আরও অনেকেই অযোগ্য থাকতে পারেন, তাঁদের বাছাই সম্পূর্ণরূপে এখনও করা সম্ভব হয়নি। চাকরি থাকল কেবল একজনেরই।কেবলমাত্র একজন সুনির্দিষ্ট ক্যান্ডিডেট সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। সোমা দাস নামে ক্যান্সার আক্রান্ত এক প্রার্থী, তাঁর চাকরি বহাল থাকছে। চাকরি বহালের নির্দেশ কেবলমাত্র তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।‘কাদের বেতন ফিরত দিতে হবে’সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রায় ২৬ হাজার চাকরি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেল। কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের পর সকলের ধারণা ছিল, সুুপ্রিম কোর্ট হয়তো মানবিকতার কারণে বেতন ফেরতের অর্ডারটা পুর্নবিবেচনা করতে পারে। কিন্তু সেই অর্ডারটাও সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। বেতনের টাকা ফেরত দিতে হবে।” কিন্তু কাদেরকে? সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যাঁরা চিহ্নিত অযোগ্য, তাঁদের বেতনের টাকা ফেরত দিতে হবে। আইনজীবী ফিরদৌস শামিম জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের তরফে তিনটে ক্যাটাগরি করে দেওয়া হয়েছে। কারা কারা ব্ল্যাঙ্ক ওএমআর শিট জমা দিয়েছিল, তাঁদের নামের তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা রয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টে সেই তালিকা জমা পড়ে। তাঁদেরকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এতদিন তাঁরা যে বেতন পেয়ে এসেছেন, অর্থাৎ ২০১৬ সাল থেকে, তার ১২ শতাংশ সুদের হারে টাকা ফেরত দিতে হবে। ফ্রেশ সিলেকশন প্রসেসে তাঁরা বসতে পারবেন না।সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, এত বড় প্যারামিটারের যে বেনিয়ম হয়েছে, সেটা কোনওভাবেই বাছাই সম্ভব নয়। তাই সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করা হয়েছে। একজন ‘ডিজ়এবেল গ্রাউন্ডে’ যে পিটিশন দিয়েছিলেন, তাঁর ক্ষেত্রে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে, সেটাও বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। তাঁর চাকরি বহাল থাকবে।’ফ্রেশ সিলেকশন প্রসেসে’ কারা কারা বসতে পারবেন?২০১৬ সালে যাঁরা যাঁরা আবেদন করেছিলেন, শুধুমাত্র চিহ্নিত অযোগ্যরা বাদে, প্রত্যেকে ফ্রেশ সিলেকশন প্রসেসে অংশ নিতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই যেহেতু প্রভাবিত, তাই যোগ্য অযোগ্য পৃথকীকরণ শেষ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি।আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের আবেদন মেনে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, সিলেকশন প্রসেস তিন মাসের মধ্যে করা হোক।২০১৬ সালের এসএসসি-র শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। কলকাতা হাইকোর্ট এই সংক্রান্ত শুনানির পর ২০১৬ সালের সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাতিল করে দিয়েছিল। এর ফলে ২৫,৭৫৩ জনের চাকরি যায়। এসএসসির প্রায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের এই মামলায় একাধিক জটিলতা ছিল। যার মধ্যে অন্যতম হল যোগ্য এবং অযোগ্যদের বাছাইয়ের সমস্যা।