প্রভাবভিত্তিক সিএসআর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উপর জোর ICC সম্মেলনে
কলকাতা, ১২ মার্চ: কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমকে কেবল প্রতীকী দান বা অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা যেন সুসংগঠিত, পরিমাপযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়—এই বার্তাই উঠে এল ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) আয়োজিত অষ্টম সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট সামিট ও অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সিএসআর উদ্যোগকে এমনভাবে পরিকল্পিত করতে হবে যাতে তা সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
আইসিসির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সেঞ্চুরি প্লাইবোর্ডস (ইন্ডিয়া) লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর কেশব ভাজাঙ্কা বলেন, দ্রুত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে চলা ভারতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে এসেছে। পাশাপাশি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সিএসআর ও দাতব্য তহবিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
টেকসই উন্নয়নের প্রসঙ্গে ন্যাশনাল বোর্ড ফর আইটি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনবিআইআরটি)-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এস পি গন চৌধুরী বলেন, টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি জানান, ভারতে ইতিমধ্যেই ১৪০ গিগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ ক্ষমতা স্থাপিত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির বিস্তার, গ্রিন পাওয়ার করিডর এবং হাইব্রিড নবায়নযোগ্য প্রকল্প কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, এলইডি আলো, স্টার রেটেড যন্ত্রপাতি এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণের মতো শক্তি দক্ষতা উদ্যোগ ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি লিথিয়াম-আয়ন, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো প্রযুক্তি বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার ঘটিয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবস্থার দিকে রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমন অর্জনে গবেষক, শিল্প এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মণিপাল হাসপাতালের ডিরেক্টর ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট কার্ডিয়াক সার্জন ডা. কুণাল সরকার বলেন, ভারতে বর্তমানে বছরে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ হার্ট সার্জারি করা হয়। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হল স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তিনি জানান, স্বাধীনতার সময় যেখানে ভারতে গড় আয়ু ছিল ৪০ বছরের নিচে, বর্তমানে তা প্রায় ৭০ বছরে পৌঁছেছে। নারীদের গড় আয়ু একসময় ছিল মাত্র ৩২ বছর এবং সাক্ষরতার হার ছিল ২০ শতাংশেরও কম।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি স্থির রয়েছে এবং এখনও ১০০টিরও বেশি জেলায় সাক্ষরতার হার প্রায় ৫০ শতাংশের মতো। পোলিও নির্মূল এবং কমিউনিটি শিক্ষা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যে বেসরকারি সংস্থাগুলির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলেও তিনি জানান। তাঁর মতে, সর্বশিক্ষা অভিযানের মতো কর্মসূচি এসব উদ্যোগ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে।
ডা. সরকার আরও বলেন, দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৩০০ শতাংশ এবং শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ২০০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে চিকিৎসার জন্য উন্নত দেশ থেকেও বহু রোগী ভারতে আসছেন। সমাজসেবামূলক উদ্যোগে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরও বেশি ব্যবহার প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
রাজীবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাজীবা সিনহা বলেন, সিএসআর কার্যক্রমের লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আনা, শুধু স্বল্পমেয়াদি দান নয়। পশ্চিমবঙ্গের হ্যান্ডলুম খাতে উদ্যোগের ফলে মসলিন তাঁতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নানুরে কান্থা শিল্পীদের উন্নত বাজার সংযোগ তৈরি হওয়ায় বহু মহিলার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও তিনি জানান।
কনসালটিভোর সিইও সৈকত বসু বলেন, কার্যকর সিএসআর কর্মসূচির জন্য সুপরিকল্পিত নকশা, নির্ভরযোগ্য বেসলাইন তথ্য, সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অপরিহার্য। তিনি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সিএসআর উদ্যোগকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি শিল্প, সরকার এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আইসিসির ডিরেক্টর জেনারেল ডা. রাজীব সিং বলেন, সরকারের পাশাপাশি শিল্প, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগই ভারতের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, টেকসইতা এবং উদ্ভাবনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।










