নৈঃশব্দ্যের কবি ও আর্তনাদক্লান্ত গদ্যকার তৈমুর খান,

ফজলুল হক,

তৈমুর খানের কবিতার পীড়িত আর্তনাদ সারা বাঙলার কাব্যরসিকগণের হৃদয়মহলে স্পর্শ করে চলেছে শূন্য দশক থেকে শুরু  করে এখন অবধি। আরও দশকের পর দশক তার কবিতারা শাসন করবে বাংলা কাব্য সাহিত্য। সারা বাংলার কবিতাপ্রেমী তৈমুর খান এর কবিতায় মুগ্ধ। এর বাইরে কবি যে একজন নির্ভিক গদ্যকার,একজন বিদগ্ধ প্রাবন্ধিক তেমনটাও এতদিনে চিনে ফেলেছে পাঠক। তাঁর গদ্য পড়ে আমিও মুগ্ধ।সেই মুগ্ধতা থেকে কিছু শব্দবাক্য একেবারে আমার নিজের মতো করে।খুব স্বাভাবিক ভাবে অন্যদের ভিন্ন মত থাকতে পারে।
মহাশূন্যের নিবিড় আর্তনাদের বিস্ফোরণ সৃষ্টি জগতের অভিমুখ হয়ে এক অবিস্মরণীয় অতিবিস্ময়কর সৌরমণ্ডল,কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জের জন্ম ও মহাজাগতিক সৌরশক্তির ক্রিয়াকলাপ ঘটে চলেছে বহু বহুকোটি শতাব্দীর অতীত গভীর থেকে এখন অবধি। তেমনই এক বিস্ফোরণ মানবশরীরের অভ্যন্তরে ঘটে চলে জাগতিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ায়। মানব মনের পবিত্র অধিকারী হয়ে ওঠা মানুষ ক্রমগত তাঁদের সৃষ্টি বৈচিত্র‍্যময় স্রষ্ঠা হয়ে ওঠেন।কবি,লেখক সাহিত্যিক হয়ে,একজন শিল্পী হয়ে সংস্কৃতি জগতে অমর হয়ে থাকেন। তেমনই মহান আর্তনাদের ভেতর কবি তৈমুর খান এর স্বরপুষ্ট শব্দগুলি পবিত্র নৈঃশব্দ্যের আলোকোজ্জ্বল অনুভূতিকাতরে জন্ম নিয়ে অমর হয়ে থাকবে। যেখানে পাঠক খুঁজে পাবেন বঞ্চিত নদীর স্রোতবিহ্বল ব্যথার স্মৃতিসমুদ্র। তৈমুর খান সেই স্মৃতিসমুদ্রের একজন দক্ষ নাবিক। আর তিনি সেই সমুদ্রগভীর থেকে এক একটি উজ্জ্বল রত্ন তুলে সাজিয়েছেন একাধিক কাব্যগ্রন্থ ও মণি মুক্তোখচিত গদ্যগ্রন্থ আত্মক্ষরণ,আত্মসংগ্রহ,আত্মস্বর ইত্যাদি।
তাঁর গদ্যশৈলীর উদ্রেককর ক্ষমতা লাভ করার কারণগুলি স্পর্শকাতর। তিনি দৈনন্দিন বিলাসহীন যাপন অভিজ্ঞতা ও সংবেদন থেকে জীবনের অত্যাবশ্যক বিষয়গুলি সমৃদ্ধ করেছেন যা একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ,রসাত্মবোধক মজলিসে রূপায়িত করতে সক্ষম। সেই মজলিস সাধারণ মানুষের অনুভূতি মামুলি জিনিসের প্রতি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বোধ,ভঙ্গি,উচ্চারণ ও মনোভাব তাঁর নিজস্ব জীবন ও ঘটনাবহুল নির্মম বাস্তব মিলে মিশে একাকার। বিচিত্র ঘটনা বহু  স্বরের ধ্বনি,শব্দ, কথা ভাষা, রুচি গন্ধ ও রং তাঁর জীবনের সাথে কীভাবে যে মানানসই হয়ে উঠেছে তা এক বিস্ময়। তাঁর গোটা জীবন একটি ধ্রুপদী উপন্যাস। যেখানে সংলাপ,গল্প,বিশ্বাস সংবেদন দৈনন্দিন যাপনপ্রবাহে জীবনের সম্পূরক হয়ে উঠেছে। আমরা যারা শিল্প সাহিত্য জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করি তাদের ভাবনায় তৈমুর খান এর গদ্যগুলি আকর্ষণীয় উৎস। কবিতাও হয়ে উঠতে পারে। কবির দীর্ঘশ্বাস পতনের ধস নামা ছায়ার ভেতর নিরন্তর হেঁটে যাওয়া মামুলি কিছু নয়।
যেমন কবি তৈমুর খান হেঁটে যান..
.”কষ্ট এত সহজ হয়ে আসে
মেঘ ঝলকে উঠেছে পাতাল তার
বোহেমিয়ান একটি যুগের নম্র ক্ষেত্রে থেকে
ডাকছে তাকে-ডেকে ডেকে প্রশ্রয়ের ভার
ছুঁয়ে যাচ্ছে অবনত সকল অহংকার
তার সঙ্গে সকাল জুড়ে বিকেল জুড়ে পথ
সেই পথই অলক্তিকার উড়ানো এক মথ
উদয়-অস্ত সূর্যগানে দ্রবস্নানে কুড়োচ্ছে ফুলজল
ফুটে থাকা কাহিনি সব,কাহিনিতেই মুগ্ধতা ঝলমল “

তৈমুরের গদ্যগুলি পাঠকমহলে বিশ্বস্ত হয়ে উঠবে কিনা অথবা এই গদ্যগুলি সাহিত্য সৃষ্টির উপকরণ হবে কি না সৃষ্টির কৌশলরহস্যে এ বিতর্ক চলতে থাকলেও দেখার বিষয় গদ্যগুলির নায়ক তৈমুর খান নিজেই। একটি উপন্যাসের একমুখী নিরিহ চরিত্রের মতো। আর একথা ঠিক যে পাঠক গদ্যগুলি পাঠ করার সময় বিচিত্র কল্পনার জগতে বিচরণ করে বাস্তবের নিষ্ঠুরতার কাছে পাঠককে নত হতে হয়। তাই কখনো আনন্দ কখনো হতাশার মধ্যে ডুবে যেতে হয়। নিসর্গচিত্রের সুন্দর দৃশ্যগুলির সাথে মানুষ চরিত্রের পরস্পর বিরোধী ইচ্ছগুলি তৈমুর খান এর গদ্যশৈলীর সহজ আবেদনে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। লেখাগুলির নিখুঁত ঐকমত্যের অনুপস্থিতিতেও সাহিত্যরস ও শিল্পশক্তি পাঠককে স্বীকার করতেই হয়।
জীবনপাত্রে এক সাথে গরল ও অমৃত পান করার আনন্দ ও যন্ত্রণা একমাত্র কবিই পেতে পারেন। তৈমুর নামের এক আত্মনিবিড় কবি অথবা নামহীন বর্ণহীন ধর্মহীন রক্ত-মাংসর মানুষ আত্মার আধার হয়ে না আধারের আত্মা এই প্রশ্ন গদ্যকার তৈমুর খান এর হৃদয়ালিন্দে নিয়ত বিরাজ করছে। আত্মার তো কোনো আকার নেই শূন্যের মতো,অথচ তার অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারে না। শূন্যতার অসীমে সব চিন্তা বিদ্যা জ্ঞান পারদর্শিতা লুপ্ত হয়ে আসে। যখন অন্ধকার আর অন্ধকারময় নৈঃশব্দ্য শূন্যতাকে গ্রাস করে তখন অন্ধকারের বুক চিরে আলোককণা দেখা দেয়। নতুন কিছু সৃষ্টিমুখ উদ্ভাসিত হয়। কবি তৈমুর খানের হৃদয়ে শূন্যতার আলো জ্বলে ওঠে। তখন তিনি জাগতিক সুখ- অসুখ পাওয়া -নাপাওয়া তুচ্ছ হয়ে সৃষ্টির এক প্লাবন বয়ে যায়। তৈমুর আলোকিত কণাগুলি অবচেতন অথবা চেতনে একত্রিত করে কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ সর্বোপরি নির্ভিক জীবনবেদের জন্ম দেন। সেইসব জীবনবেদ আত্মক্ষরণ,আত্মস্বর, আত্মখনন, আত্মসংগ্রহ।
আমাদের সমাজে রাজ্য অথবা দেশে খেটে খাওয়া জনমুনিষ দিন-আনা দিন-খাওয়া লোকের সংখ্যা চমকে দেবার মতো। সরকারি হিসাবের বাইরে কত কোটি মানুষ একবেলা খেতে পায়,কত লক্ষ মানুষ একদিন অন্তর একবেলা খাবার জোগাড় করতে পারে তা অনেকেরই কম বেশি জানা। তৈমুর তাদের একজন হয়ে শিশু  থেকে যৌবনের অর্ধেক সময় কাটিয়েছেন। তবে তাদের মতো করে নয়। তিনি সারাদিন অভুক্ত আছেন যন্ত্রণা তাঁকে আঘাত দিতে পারেনি বরং আর্তনাদের ভেতর থেকে তাঁর সৃষ্টিকে উদরভর্তি করে ক্ষুধা দূর করেছেন। সৃষ্টির মহাহড়পায় শরীর মন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি তাই সহজেই বলতে পারেন,” পাশ দিয়ে কত ঝড় চলে গেছে। ডানাওয়ালা মানুষ উড়ছে।পায়ে ঘুঙুর পরা মানুষ। কারও চোখে চোখ রাখতে পারিনি। কারও আঙুলে আঙুল। প্রতি মুহূর্তে শুধু  খিদে পেয়েছে, পাহাড়ের মতো খিদে।”
তখন আর চাঁদ-ফুল-পাখি নয়, জীবনের মর্মে মর্মে হলাহল উঠেছে, খুলে দিয়েছে সৃষ্টির দরোজা।
জীবনের আত্মক্ষরণের হাহাকার স্বর বাঁশি হয়ে বেজেছে। যাপনের বিচিত্র খেয়ালিপনা,মানুষ সৃষ্টি করা নির্যাতন,অবহেলা শাসনের নানাবিধ কৌশল, ও নিসর্গভূমে বিচরণ বিকশিত হওয়া তৈমুর খান তাঁর সাধনায় নৈকট্য ও আত্মপ্রত্যয় জাগিয়ে তুলেছেন এক অতিরহস্যময় আলোকমালায়। জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা বৈশিষ্ট্যগুলি প্রত্যয় দিয়ে প্রশ্রয় দিয়ে আকৃতি দিয়ে এক একটি বাক্য গঠনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। রিসাইকেলবিনে সেচ্ছায় নির্বাসিত হওয়া জীবনটুকরোগুলি আপলোড করে পাঠকের নিকট সততার নজির রূপে তুলে ধরেছেন। সেই বচনগুলি হলো, আত্মক্ষরণ,আত্মস্বর,আত্মসংগ্রহ।
অভাব দারিদ্র্যের মাঝেও কবির জীবনে প্রেম আসে একান্তে চুপিচুপি। সে প্রেম ব্যর্থ হয়। কবির কলমে বেজে ওঠে ব্যথা। তিনি অকপট। কী কবিতায় কী গদ্যে। এইক্ষণেই তৈমুর খান অন্যদের থেকে আলাদা ভিন্ন অথবা অন্য কোনো শব্দ দিয়ে পার্থক্য বোঝানো যা আমার জানা নেই। এমন অকপট আমি অন্যদের দেখিনি। জীবনকে পাঠকের হাতে তুলে দেয়া ভালো মন্দের বাছবিচার না করেই সত্যের প্রতি নত হতে তৈমুর খানই পারেন। তাই তার অসম প্রেমও খোলামেলা। তাঁর স্বীকার ও বচনভঙ্গিমা ভিন্ন। পড়তে ইচ্ছে করে বারবার।
” আমি দূর থেকে আকাশের তারার মতো ওকে দেখি। চিরদিন ও কিশোরী।একটুও বয়স বাড়ে না। আমার দুপুর গড়িয়ে যায়। ক্লান্ত বিকেল আসে। চোখে কান্নার দাগ মুছি।তবু ভিজে থাকে। এক একাকিত্ব আমাকে আড়াল করে রাখে। কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। ঝাপ্সা অন্ধকারে ফাঁকা উঠান ভরে যায়। তখন ও আসে। বেণী দুলিয়ে হাসে। ডান হাতখানা বাড়িয়ে দেয়। এত স্নিগ্ধ হাত! আশ্চর্য হ ই। বিশ্বাস হয় না। একবার চুমু  খাই। দুবার খাই। বারবার খাই।
একটি হাত আমাকে বাঁশির মতো বাজায়। কবিতা লেখায়। শাসন করে। একটি হাত শুধু  আমাকেই ডাকে। সারাজীবন ডাকে। ডাকতে ডাকতে প্রথম বর্ষা নামায়। “
তারপর প্রেমিকাটি বড় হয় কবির সাথে সাথে। ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় হৃদয়ে হৃদয়ে। কবি চোখের আড়াল হলে চিঠি লেখে।
তুমি যদি নৌকা ভিড়াও ওপার হই আমি
তুমি যদি হাত রাখো হাতে
চলতে পারি একসাথে
শেষপর্যন্ত নৌকা ভেড়েনি ঘাটে। নদী বয়ে চলে। কবি কোন আশায় ওপাশ দিয়ে হাঁটে – জানে না
জানে তাঁর কবিতা

“বেজে উঠছে বাসনকোসন
অদ্ভুত তোমার রাঙা হাত
কৃষ্ণ টি কোথায় গেছে?

টিউশন সেরে রোদে রোদে
আমার সাইকেল
সারাদিন আমাকে ঘোরায়

টেপে বাজছে হিন্দি গান
একা তুমি কলতলায়
কৃষ্ণের জন্য কি আজ মাংস ভাত?

ঝকঝকে থালায় মুখ।
স্বপে ঢুকে যাব-
তোমার পেটের ভ্রূণ হয়ে
ফিরে আসব আজকে রাতেই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *